বোয়ালিয়া ঝর্ণা আকৃষ্ট করছে পর্যটকদের

Comments · 1948 Views

ঝর্ণার রাজ্য হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে

ঝর্ণার রাজ্য হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বোয়ালিয়া নামে নতুন একটি ঝর্ণা যুক্ত হয়েছে। অন্যান্য ঝর্ণা থেকে একেবারেই আলাদা এই ঝর্ণাটি খুব বেশি দিন আগে আবিষ্কৃত হয়নি। নতুন এই ঝর্ণা দেখতে প্রতিদিন শত শত পর্যটক ভিড় করছেন। ছোট কমপ্লেক্সে পাঁচটি ঝর্ণা রয়েছে এবং একটি অবর্ণনীয় সুন্দর পাথুরে ঢাল যাকে বলা হয় উদন ঢল। এই ট্রেইলের প্রধান ঝর্ণা বোয়ালিয়া এবং এই ঝর্ণায় যাওয়া খুব সহজ। বোয়ালিয়া ঝর্ণার বিশেষত্ব হলো এই ঝর্ণার অদ্ভুত আকৃতি। এর আকৃতি ব্যাঙের ছাতার মতো এবং বোয়াল মাছের মাথার কারণে হয়তো এর নাম বোয়ালিয়া।

ভারী বর্ষাকালে বোয়ালিয়া খুব মারাত্মক রূপ ধারণ করে এবং এই সময়েই জলপ্রপাতটি সবচেয়ে সুন্দর হয়। মূল ঝর্ণার পানি যেখানে পড়ে সেটি গুহা বা গভীর খাদের মতো। বর্ষা মৌসুমে আপনাকে এই বসন্তে সাঁতার কাটতে হবে। ঝর্ণার উপরে আরও ছোট ছোট ফোয়ারা রয়েছে এবং জলপ্রপাতটি খুবই সুন্দর। কিন্তু বোয়ালিয়ার উপর দিয়ে যাওয়া খুবই বিপজ্জনক এবং পূর্ণ বর্ষায় প্রায় অসম্ভব।
বোয়ালিয়া ট্রেইলে মূলত দুটি অংশ রয়েছে, উত্তর-পূর্ব এবং পূর্ব-পূর্ব। বোয়ালিয়া যা দানির পূর্বদিকে খুব বেশি নয়। যাইহোক, উত্তর-পূর্ব দিকে ট্রেইলে বিভিন্ন নামের চার-ছয়টি ছোট ঝরনা রয়েছে।
বেশিরভাগ যাত্রী বোয়ালিয়া দেখতে আসেন কিন্তু উত্তরের ঢাল বা নাহাতিকুম ঝর্ণা পর্যন্ত যান না। তবে উঠানে যেতে হলে অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়। পুরোটা পথ হাঁটতে হবে।

বর্ষাকালে প্রচুর পানি থাকে। এমনকি কোথাও কোথাও বুকের স্তর পর্যন্ত পানি রয়েছে। এ এলাকায় প্রচুর বালু ও অনেক পাথরের কারণে হাঁটা খুবই কষ্টকর। তার উপরে ভয়ঙ্কর বাঁশের কঞ্চি বা গাছের ডাল। এই ছড়াটা বেশ অশুদ্ধ মনে হয়। সম্ভবত এই রাস্তায় যানবাহন কম থাকায় পাথরগুলো অত্যন্ত পিচ্ছিল। এই ঘুরপথে প্রচুর বাঁশঝাড় দেখা যায়। পথে রয়েছে ছোট ছোট ঝর্ণা।

ঝিরি পথ দিয়ে ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর দেখা মিলবে উতন ঢল। এই ঢাল অবিশ্বাস্যভাবে সুন্দর. পাহাড়ের গায়ে পাথরের আস্তরণ আর পাহাড়ের গা বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে, এমন সুন্দর দৃশ্য দেখলে যে কারোরই মন গলে যাবে।


উটন ঢালের পরের পথটা খুবই ভীতিকর কিন্তু অসম্ভব সুন্দর। বড় পাথর এবং ছোট পাথরের সংগ্রহ। এই পথটা খুবই পিচ্ছিল। নাহাতিকুম ঝর্না প্রায় 10 মিনিট হাঁটার পর পাওয়া যাবে। এই ঝর্ণার উচ্চতা খুব বেশি না হলেও বেশ চওড়া। পুরো ঝর্ণা থেকে নেমে আসা পানির সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। অনেকের মতে নাহাতিকুমের পরে আরও ঝরনা আছে। না জানি আরো কত রহস্য আর সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এভাবে।

কথা হয় বোয়ালিয়া ঝর্ণায় আসা একদল তরুণের সঙ্গে। যার নেশায় বিচরণ করছে মিরসরাইয়ের নতুন ঝরনা। তাদের একজন সোনালী স্বপ্ন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মইনুল হোসেন টিপু। তিনি জানান, বছরের দুই ঈদ বা যেকোনো ছুটিতে তারা বিভিন্ন পর্যটন স্পটে ঘুরে বেড়ান। বিশেষ করে এখানকার ঝর্ণাগুলো আশ্চর্যজনক। একে একে খৈয়াছড়া ঝর্ণা, নাপিত্তাছড়া, বাওয়াছড়া, রূপসী ঝর্ণা ঘুরে দেখা হয়েছে। এই প্রথম বোয়ালিয়া ঝর্ণায় এসেছি। এই ঝর্ণাটি এক কথায় অসাধারণ। তবে যাত্রা কঠিন। যাতায়াতের পথ সহজ হলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে বলে জানান তিনি

তিনি আরও বলেন, ঝর্ণা যাওয়ার আগে বা ঝর্ণায় যাওয়ার পর ব্র্যাক পোল্ট্রি ফার্মের পূর্ব দিকে পাহাড়ি রাস্তা একটু বাঁক নিলেই যাত্রা সম্পূর্ণ হবে। এই রাস্তা দিয়ে ফটিকছড়ি যাওয়া যায়। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা আর সবুজ যে কাউকেই মুগ্ধ করবে।

যেভাবে যাবেন: দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই সদরে গাড়ি থেকে নামতে হবে। তারপর মিরসরাই বাজার হয়ে পূর্ব দিকে নেমে ব্র্যাক পোল্ট্রি ফার্মে যান অর্থাৎ পাহাড়ের পাদদেশে সিএনজিতে জনপ্রতি ভাড়া ১৫ টাকা। সেখান থেকে পাহাড়ি পথ ধরে বা পায়ে হেঁটে বড় নদী পাওয়া যায়। সেখান থেকে উত্তরে গেলে পাবেন উথান ধল ও নাহাতিকুম ঝর্ণা আর পূর্ব দিকে গেলে পাবেন বোয়ালিয়া ঝর্ণা।

সতর্কতা: এই ট্রেইলে ভয়ঙ্কর জোঁকের আক্রমণের জন্য প্রস্তুত থাকুন। ভারী বর্ষণের সময় পাহাড়ি স্রোতে পড়ে গেলে বিপদ ও পানি ছড়িয়ে পড়ার পরিমাণও বেশি থাকে। পাথরগুলো খুবই পিচ্ছিল এবং সারা পথে প্রচুর বাঁশের কঞ্চি ও গাছের ঢাল রয়েছে। সাবধানে চলুন এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করুন।

থাকা ও খাওয়া: মিরসরাই সদরে পার্কিন রেস্তোরাঁ, কাশবন ও বারইয়ারহাটে গ্রীনপার্ক রেস্তোরাঁ রয়েছে। তবে থাকা-খাওয়ার জন্য পর্যটন স্পট থেকে এক ঘণ্টার দূরত্বে চট্টগ্রাম শহরের এ কে খান ও অলংকার মোড়ে রয়েছে কুটুমবাড়ি রেস্টুরেন্ট। আবাসনের বিকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে মিয়ামি রিসোর্ট এবং মার্জিত রোজভিউ রেসিডেন্স হোটেল।

প্রকৃত বোয়ালিয়া ট্রেইল এর সাতকাহন-
এই বছরের জুন মাসে আমার আর খালিদের প্রথম সীতাকুণ্ডে পা ফেলা। সীতাকুণ্ড ভ্রমণ আমাদের মনপ্রানকে এমনভাবে আকৃষ্ট করে যে এর সৌন্দর্যের কাছে নতি শিকার করতে পরবর্তী জুলাই মাসে আমরা দুই ভাই আবার যাই সেখানে। জুলাই মাসের ভ্রমনে আমাদের ঘুরাঘুরির লিস্টে মিরসরাই এর বোয়ালিয়া ট্রেইল ছিল কিন্তু ভাগ্যের নিদারুণ পরিহাস যাকে বলে... গাইড না নেবার ফলে বোয়ালিয়া ট্রেইল এর রাস্তা গুলিয়ে ফেলে আমরা অজানা একটা ট্রেইল ঘুরে আসি। ঘুরোঘুরি শেষে অবশ্য ততটা আফসোস হয় নি কারন অজানা ট্রেইলটা বেশ রোমাঞ্চকর এবং প্রকৃতির নির্ভেজাল সৌন্দর্যে ভরপুর ছিল। সেবার ঘুরাঘুরি শেষে প্রকৃত বোয়ালিয়া ট্রেইলটা ঘুরার ইচ্ছেটা অদম্য ছিল তাই পরবর্তী সেপ্টেম্বর মাসেই
বেশ কয়েকজন শুভাকাঙ্খিদের নিয়ে ঘুরে আসি সীতাকুণ্ডে। আবারো খারাপ ভাগ্য যাকে বলে, সেই ট্যুর পুরোটাই আমার আর খালিদের কাছে মারা খাওয়া ট্যুর ছিল। পাশাপাশি বোয়ালিয়া ট্রেইল না ঘুরে যাওয়া হয়েছিলো কমলদহ ট্রেইল এ।
শেষমেশ চতুর্থবারের মতো আমি আর বন্ধু আলি অক্টোবর মাসের একেবারে শেষ সময় এসে রওনা দেই সীতাকুণ্ডের উদ্দেশ্যে। ভোরবেলা ট্রেইন থেকে নেমেই সীতাকুণ্ডে এসে খাবার পর্ব সেরে রওনা দেই মিরসরাই এর ব্র্যাক পোল্ট্রি ফিড এর উদ্দেশ্যে। বাস থেকে মিরসরাই বাজারে নেমে খানিকটা পথ হেটে, মিরসরাই কলেজ এলাকা থেকে সিএনজিতে রওনা দেই ব্র্যাক পোল্ট্রি ফিড এর দিকে। যেখান থেকে পায়ে হেটে ছুটতে হবে বোয়ালিয়া ট্রেইল এর উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে সিএনজিতেই ইমামুদ্দিন ভাই এর সাথে পরিচয় হয়, যাকে আমরা পরবর্তীতে গাইড হিসেবে আমাদের সাথে নিয়ে নেই। সিএনজি থেকে নেমেই ১ টা মুদি দোকান আর চা এর দোকান পাই। সেখান থেকে হালকা নাস্তা সেরে আর সাথে কিছু শুকনো খাবার নিয়ে রওনা দেই ট্রেইল এর দিকে।
বন্ধু আলির জন্যে স্মরণীয় ছিল এই ট্রেইলটা কারন এটা ওর জীবনের প্রথম ট্রেকিং। পথিমধ্যেই আবার বৃষ্টি শুরু হয়, যাকে বলে বিড়াল-কুকুর বৃষ্টি। গোড়ালি সমান কাঁদা পেরিয়ে গায়ের এলোমেলো পথ দিয়ে হাটতে হয় প্রায় ২০ মিনিট যাবত। তারপর দেখা পাই অমৃতসুধার আরকি ঝিরিপথের। এমনিতেই শীতের শুরুর দিক
তার উপরে ঝিরির পানি। বরফজলের স্পর্শে সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। ঝিরি ধরে কিছুক্ষণ হেটে আবার ঢুকে যেতে হয় জঙ্গলের মতোই ঝোপঝারের দিকে। ঝিরি ধরে আরও ২০ মিনিট এগোই সামনে তারপর ঢুকে পড়ি ট্রেইল এ।
ইমামুদ্দিন ভাই আমাদেরকে বললেন আমরা প্রথমেই বোয়ালিয়া ট্রেইল এর বোয়ালিয়া ঝর্নাটা দেখতে চাই নাকি আগে বাকি ঝর্না গুলো ঘুরে এসে তারপর দেখতে চাই? ভাগ্যিস বোয়ালিয়া ঝর্নাটা আমরা পরে দেখতে চেয়েছিলাম না হলে ওটা দেখার পর বাকি সব ঝর্না গুলো দেখতে খুবই কদাকার লাগতো। কারন বোয়ালিয়া ব্যাটা একটা দানব আকৃতির মগের মতো, যেনো পানি ধরে না রাখতে পেরে মগ উপচে পানি পড়ছে।
ট্রেইল ধরে হাটতে গিয়ে কাটা ঝোপ-ঝাড় মাড়িয়ে চলতে হয়েছে ।মাঝে মাঝে বুক অবধি পানি এসে ঠেকছে, বৃষ্টির কারনেই কিনা জানিনা জোঁক ধরেছে কিছুক্ষনপর পরেই। ডান বাম করে ঝর্নাগুলো দেখতে পেয়েছিলাম। যেমন, ' বাইশ্যা ছড়া, পালাকাটা খুম, উঠান, আন্ধার-মানিক ঝর্ণা, তিন নং ছড়া, এবং ন'হাতে খুম। এর আগে কিছু ট্রেইল এ যাবার সৌভাগ্য হয়েছে আমার তবে এরকম বিচিত্র আর পিচ্ছিল ট্রেইল ছিল না সেগুলো। আর জোঁকের উৎপাত না বললেই নয়, পুরো ট্রেইল শেষ করে যখন হাত-পা ধুচ্ছিলাম তখনো
জোঁক পা কামড়ে ধরে রেখেছিল এমন অবস্থা। পুরো ট্রেইল এ আলির কোনো সমস্যা হয় নি। কোনো পিচ্ছিল জায়গায় হোঁচট ও খায়নি। শুধু দু-চারবার জোঁক ধরেছে আর কি। সে হিসেবে ওর প্রথম ট্রেকিং বেশ সুন্দরভাবেই হয়েছে তা বলা যায়। ট্রেইল এর পথ মারাত্মক পর্যায়ের সুন্দর ছিল, ঘণ্টার পর ঘণ্টা হা করে তাকিয়ে থেকেও যেনো সাধ মিটে না। ট্রেইল শেষ করে বের হবার পর প্রশান্তিতে মন ভরে গেলো যে অবশেষে বোয়ালিয়া ট্রেইল সমাপ্ত করতে পারলাম ?
গাইড এর ব্যাপার নিয়ে একটা কথা বলি, অনেকসময় গাইড নিয়ে ট্রেইল এ গেলে তারা তাড়াহুড়ো করে সবকিছু না দেখিয়েই চলে আসতে চায়... আপনি যদি না জানেন সামনে আরও ঝর্না বা সুন্দর জায়গা আছে তাহলে তারা আপনাকে অল্পের ভেতর ঘুরিয়ে নিয়ে এসে বলবে সব দেখা হয়ে গেছে। সব গাইডই যে এমন তাও না, আমাদের গাইড ইমামুদ্দিন ভাই সেই কাতারেই পড়েন। ইমামুদ্দিন ভাই পুরো ট্রেইলটা খুব আগ্রহ নিয়ে আমাদের ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন, এমনকি অতি পিচ্ছিল জায়গাগুলোতে এই লোকটি আমার মতো
অকালকুষ্মাণ্ডটাকে হাত ধরে ধরে পাড় করিয়ে দিয়েছেন। এমন গাইড নিয়ে ঘুরার মজাই আলাদা। আপনারা কেও বোয়ালিয়া ট্রেইল এ এই সাদাসিধে লোকটাকে গাইড হিসেবে নিতে চাইলে নিচের নাম্বার এ কল দিয়ে আগে থেকে তার সাথে যোগাযোগ করে নিতে পারেন ?
গাইড ইমামুদ্দিন :
 
পুরো বোয়ালিয়া ট্রেইল এ ময়লা দেখি নি বললেই চলে। আসুন ভ্রমনে গিয়ে যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
Comments